মানবতা, সাহস ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মরণোত্তর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার-এ ভূষিত হয়েছেন মাইলস্টোন স্কুলের সাহসী শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুর একটার পর রাজধানীর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় ভবনটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশ আতঙ্কে ভরে ওঠে।
দুর্ঘটনার সময় একটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছিলেন শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী। বিস্ফোরণের পর চারদিকে যখন সবাই নিজের জীবন বাঁচাতে ছুটে বেড়াচ্ছিল, তখন তিনি অসাধারণ সাহসিকতা ও মানবিকতার পরিচয় দেন। নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে তিনি তার শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে বের করে আনতে শুরু করেন।
শিক্ষার্থীদের একে একে ক্লাসরুম থেকে বের করে দিতে গিয়ে আগুনে দগ্ধ হন তিনি। এতে তার শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ পুড়ে যায়। কিন্তু নিজের জীবন বিপন্ন হলেও তিনি বাঁচিয়ে দেন ১৩টি নিষ্পাপ শিশুর জীবন।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি এমন কেন করলে? আমাদের সন্তানদের কী হবে?” জবাবে মাহেরিন চৌধুরী আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন, “ওই বাচ্চাগুলোও তো আমার সন্তান। ওদের মৃত্যুর মুখে ফেলে আমি কী করে বের হয়ে আসতাম?”
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে ২২ জুলাই ২০২৫ এই মহীয়সী শিক্ষিকা মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার অসীম সাহস, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার এই মহান দৃষ্টান্ত দেশবাসীর হৃদয়ে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
তার এই অনন্য আত্মত্যাগ ও মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। তার এই ত্যাগ শুধু একজন শিক্ষকের দায়িত্ববোধই নয়, বরং মানবতার সর্বোচ্চ উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।